৭০–৮০ টাকার মজুরিতে ধুঁকছে বেগমপুরের ঐতিহ্যশালী তাঁত শিল্প
আইসিইউতে শিল্প, চোখের জলে দিন কাটাচ্ছেন তাতিরা
✍️ রিপোর্ট : সৌরভ আদক
📍 বেগমপুর | সিঙ্গুর টিভি নিউজ :
হুগলির বেগমপুর—একসময় যে নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে ছিল ঐতিহ্যশালী তাঁত শিল্প, আজ সেই শিল্প কার্যত ধ্বংসের মুখে। তাতিদের কথায়, “এই শিল্প এখন আইসিইউতে। এখান থেকে ভেন্টিলেশনে যাবে না কি জেনারেল বেডে ফিরবে—সেটাই প্রশ্ন।”
দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পরিশ্রম করেও একজন তাতি পাচ্ছেন মাত্র ৭০ থেকে ১০০ টাকা, কোথাও বা সর্বোচ্চ ১২০ টাকা। এই আয় দিয়ে সংসার চালানো কার্যত অসম্ভব। ফলে নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে চাইছে না। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী ২–৩ বছরের মধ্যেই বেগমপুরের তাঁত শিল্প সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
🧵 “সেই সময়টা দিন ছিল, আজ রাত”
৫৭ বছর ধরে তাঁত বুনছেন ৬৮ বছরের এক প্রবীণ তাতি। তাঁর কথায়,
“সেই সময়টা যদি দিন হয়ে থাকে, আজকের সময়টা রাত। তখন ৬–৮টা বাচ্চা নিয়ে সংসার চলত, আজ একটা-দুটো নিয়েও চলে না।”
একসময় বেগমপুর অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ তাঁত শিল্পের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। বাবা-ঠাকুরদার আমল থেকে এই শিল্পই ছিল জীবিকার একমাত্র ভরসা। আজ সেই খটখট তাঁতের শব্দ প্রায় হারিয়ে গেছে।
📉 কেন ভেঙে পড়ছে তাঁত শিল্প?
স্থানীয় তাতিদের মতে, একাধিক কারণে এই শিল্প আজ ধ্বংসের পথে—
- সুতো ও কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি
- আধুনিক মেশিন ও কম্পিউটার ডিজাইনের সঙ্গে হাতে বোনা শাড়ির প্রতিযোগিতা
- বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া
- দীর্ঘ কর্মঘণ্টার তুলনায় অত্যন্ত কম মজুরি
- নতুন প্রজন্মের অনীহা
একসময় ঘরে ঘরে সাধারণ শাড়ি পরার চল থাকলেও এখন সেই অভ্যাস প্রায় উঠে গেছে। যেটুকু চাহিদা আছে, তা মূলত কমদামের মেশিনে তৈরি ঝকঝকে কাপড়ের দিকে ঝুঁকছে।
🏛️ রাজনৈতিক চাপানউতোর
এই শিল্পের দুরবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও তুঙ্গে।
বেগমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান বরুণ কুণ্ডুর দাবি,
“তাঁত শিল্পের বর্তমান অবস্থার জন্য কেন্দ্র সরকার দায়ী। সুতো ও কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছে কেন্দ্র। রাজ্য সরকার শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।”
অন্যদিকে, বেগমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিরোধী দলনেতা ও প্রাক্তন প্রধান সমীর রায়ের বক্তব্য,
“কেন্দ্র ও রাজ্য—দুটো সরকারই দায়ী। শিল্পের নামে শুধু উৎসব হচ্ছে, বাস্তবে শিল্প বাঁচানোর কোনও কার্যকর উদ্যোগ নেই।”
এই রাজনৈতিক চাপানউতোরের মাঝেই চোখের জল ফেলছেন তাতি সম্প্রদায়ের মানুষজন।
🧶 সরকারি উদ্যোগ কি যথেষ্ট?
হ্যান্ডলুম ক্লাস্টার, প্রশিক্ষণ শিবির, মহিলা শিল্পীদের উৎসাহমূলক প্রকল্প—কিছু উদ্যোগ থাকলেও তাতিদের মতে তা পর্যাপ্ত নয় এবং দীর্ঘস্থায়ী নয়।
একজন তাতির কথায়,
“১০ ঘণ্টা কাজ করে যদি হাজার টাকাও না পাই, তাহলে অন্য কাজে গেলে বেশি রোজগার হয়। নতুন প্রজন্ম কেন এই পেশায় আসবে?”
🔴 আশঙ্কা
আজ বেগমপুরে হাতে গোনা কয়েকটি তাঁত টিকে আছে। একসময় রাস্তায় হাঁটলেই যে তাঁতের খটখট শব্দ শোনা যেত, আজ তা প্রায় নিঃশব্দ।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবেই চললে বেগমপুরের ঐতিহ্যশালী তাঁত শিল্প ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে।





