সমকামী পরিচয় বনাম সামাজিক দায়বদ্ধতা: রামপুরহাটে এক দাম্পত্য ভাঙনের অন্তর্লীন প্রশ্ন
নিজস্ব সংবাদদাতা, রামপুরহাট: চার বছরের দাম্পত্য, তিন বছরের পুত্রসন্তান, আর তারপর এক সাহসী কিন্তু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। বীরভূমের মারগ্রাম থানার বাসিন্দা ইন্দ্রানী দালাল রামপুরহাট মহকুমা আদালতে মিউচুয়াল ডিভোর্সের আবেদন জানিয়ে নতুন জীবনের পথে পা বাড়ালেন। কারণ—নিজের সমকামী পরিচয়কে স্বীকার করে বিহারের তরুণী প্রীতি কুমারীর সঙ্গে সংসার গড়ার ইচ্ছা।
ঘটনাটি সামনে আসতেই এলাকায় চর্চা শুরু হয়েছে ব্যক্তি স্বাধীনতা, মাতৃত্ব, সামাজিক চাপ এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ—এই চারটি স্তম্ভকে ঘিরে।
আইনের স্বীকৃতি, সমাজের সংকোচ : ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় Navtej Singh Johar v. Union of India–এ সমকামী সম্পর্ককে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতিসূচক সমকামী সম্পর্ক আইনসম্মত—এই বার্তা স্পষ্ট।
কিন্তু আইন বদলালেও সামাজিক কাঠামো কি বদলেছে? সমাজতত্ত্ববিদদের মতে, “যৌন প্রবৃত্তি জন্মগত। কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক চাপ বহু ক্ষেত্রেই ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলক বিষমকামী বিয়ের দিকে ঠেলে দেয়।”
ইন্দ্রানীর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর ক্ষেত্রেও বিয়েটি ছিল পরিবারের চাপে। বিয়ের আগেও এক তরুণীর সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। পরে পুলিশি হস্তক্ষেপে তাঁকে ফিরিয়ে এনে বিয়ে দেওয়া হয়। পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনে তিনি মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও, শেষ পর্যন্ত নিজের যৌন পরিচয়কে অস্বীকার করতে পারেননি।
দাম্পত্য ভাঙন না সামাজিক ব্যর্থতা? : স্বামী মিউচুয়াল ডিভোর্সে সম্মতি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন ধরে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইন্দ্রানীর সিদ্ধান্তেই সায় দেন।
এখানে প্রশ্ন ওঠে—এটি কি শুধুই এক দাম্পত্যের ভাঙন, নাকি সামাজিক কাঠামোর ব্যর্থতা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, “কম্পালসারি হেটেরোসেক্সুয়ালিটি”—অর্থাৎ সমাজের চাপে বিষমকামী বিয়ে—দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফলত দাম্পত্য ভাঙন, মানসিক অবসাদ, সন্তানের উপর প্রভাব—সবই একে একে সামনে আসে।
তিন বছরের সন্তানের ভবিষ্যৎ : সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্নটি এখানেই। তিন বছরের এক শিশু—যার মানসিক বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে মা-বাবার উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সে এখন মায়ের সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন।
আইন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দেয়। পুলিশও জানিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে ইন্দ্রানীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। কিন্তু সন্তানের মানসিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই বয়সে হঠাৎ পরিবেশ পরিবর্তন শিশুর মনে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তবে সঠিক পারিবারিক সহায়তা ও স্থিতিশীল পরিবেশ পেলে শিশুর বিকাশ স্বাভাবিকভাবেই সম্ভব।
সমাজের সামনে নতুন প্রশ্ন https://youtube.com/shorts/Jfg_zTHlsiE?si=EGHg2FGiuTY4eKv9
এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের নয়—সমগ্র সমাজের জন্য প্রশ্ন তুলে দেয়।
- আমরা কি সন্তানদের এমন পরিবেশ দিচ্ছি, যেখানে তারা নিজের যৌন পরিচয় নিয়ে খোলামেলা থাকতে পারে?
- নাকি সামাজিক লজ্জা ও রক্ষণশীলতার চাপে তাদের এমন সম্পর্কে ঠেলে দিচ্ছি, যার পরিণতি পরে আরও জটিল?
আইন যখন ব্যক্তির স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তখন সমাজের ভূমিকা কি হওয়া উচিত—সহমর্মিতা নাকি নৈতিক বিচারের আসন?
উপসংহার
রামপুরহাটের এই দাম্পত্য ভাঙনকে একপাক্ষিকভাবে দেখা কঠিন। এখানে যেমন একজন নারীর আত্মপরিচয়ের লড়াই আছে, তেমনই আছে এক শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ।
ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এই টানাপোড়েনই আধুনিক সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে—যেখানে আইন এগিয়েছে, কিন্তু সমাজ এখনও পথ খুঁজছে।





