সাপ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও—কামারকুন্ডুতে ১৯তম বার্ষিক অনুষ্ঠানে বড় বার্তা
সাপের কামড়ে মৃত্যু শূন্যে নামানোর লক্ষ্য, কুসংস্কার দূর করে বৈজ্ঞানিক সচেতনতার ডাক; রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সংগঠনকে নিয়ে ‘কনসার্ন’-এর দু’দিনের বিশেষ কর্মসূচি
নিজস্ব সংবাদদাতা, সিঙ্গুর:
সাপকে হত্যা নয়, সাপকে বুঝুন। সাপের কামড়কে ঘিরে আতঙ্ক নয়, দ্রুত চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক সচেতনতা—এই বার্তাকেই সামনে রেখে হুগলির কামারকুন্ডু ঘোলার মাঠ সংলগ্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত হল প্রকৃতি সংরক্ষণ গবেষণা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সংগঠন ‘কনসার্ন’-এর ১৯তম বার্ষিক অনুষ্ঠান।
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দু’দিন ধরে চলা এই বিশেষ কর্মসূচিতে সাপ, পাখি, বন্যপ্রাণ এবং প্রকৃতি সংরক্ষণ নিয়ে একাধিক আলোচনা, প্রশিক্ষণ ও মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাপ উদ্ধারকারী, পরিবেশকর্মী, বিজ্ঞানমনস্ক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং স্বেচ্ছাসেবীরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের মূল সুর—“মানুষ বাঁচুক, জীবজন্তুও বাঁচুক।”
সাপের বিষ মানবদেহে কীভাবে কাজ করে, সাপের কামড়ের পর কী করণীয়, সাপের কামড় প্রতিরোধ, বিষধর সাপ চেনা এবং দ্রুত চিকিৎসার গুরুত্ব—এই সমস্ত বিষয় নিয়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা হয় অনুষ্ঠানে। পাশাপাশি শহুরে পরিবেশে পাখি সংরক্ষণ এবং সাপ উদ্ধার কার্যক্রম সত্যিই কতটা সংরক্ষণে সাহায্য করে, তা নিয়েও অংশগ্রহণকারী সংগঠনগুলির মধ্যে গোলটেবিল আলোচনা হয়।
সাপের কামড়ে মৃত্যু শূন্যে নামানোর লক্ষ্য
অনুষ্ঠানে বক্তাদের কথায় বারবার উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—সাপের কামড়ে যেন আর কোনও মানুষের মৃত্যু না হয়।
সাপের কামড়ের পর অনেক ক্ষেত্রে ওঝা, ঝাড়ফুঁক বা নানা কুসংস্কারের আশ্রয় নেওয়ার কারণে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়। সেই দেরিই অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করানোর বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে BLS—Basic Life Support প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও ছিল। সাপের কামড়ের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়।
গ্রামের বাড়ি বাড়ি সচেতনতার পরিকল্পনা
আয়োজকদের মতে, শুধু সভা বা মঞ্চে বক্তব্য রাখলেই সচেতনতা তৈরি হবে না। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সাপকে ঘিরে দীর্ঘদিনের কুসংস্কার ও ভুল ধারণা দূর করতে বাড়ি বাড়ি সচেতনতা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
এই লক্ষ্যেই স্থানীয় স্তরে কাজ করা আশাকর্মীদের মাধ্যমে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে। কারণ বাড়ির মা-বোনেরা অনেক সময় সাপ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণার কারণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে পারলে সাপের কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসার প্রবণতা বাড়বে বলেই মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
এক মঞ্চে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সংগঠন
অনুষ্ঠানে জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, বর্ধমান-সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিনিধিরা যোগ দেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, সাপ উদ্ধার থেকে শুরু করে সাপের কামড়ের রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত একাধিক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
বর্ধমানের একটি BRT—Snake Bite Response Team-এর প্রতিনিধি জানান, সাপের কামড়ের পর রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে তাঁদের টিম কাজ করছে। তাঁর দাবি, নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে তাঁদের এলাকায় গত এক বছরে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, চিকিৎসার ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু সাপ নয়, গোটা প্রকৃতির ভারসাম্য
‘কনসার্ন’-এর এই উদ্যোগের পরিধি শুধু সাপ সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। পাখি, প্রজাপতি, কচ্ছপ-সহ প্রকৃতির বিভিন্ন প্রাণীর ভূমিকা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তাদের গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের বক্তব্য, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। কোনও একটি প্রাণীকে অকারণে হত্যা করলে তার প্রভাব গোটা পরিবেশের উপর পড়তে পারে। তাই প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে মানুষের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যকেও রক্ষা করতে হবে।
২০০৬ থেকে পথচলা, এবার ১৯তম বার্ষিক অনুষ্ঠান
আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে ‘কনসার্ন’-এর পথচলা। শুরুতে লোকালয়ে সাপ উদ্ধারের কাজ দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে সংগঠনের কাজ বিস্তৃত হয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণ সচেতনতা এবং সাপের কামড় নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রচারের দিকে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৫০ জন সদস্য নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় কাজ চালানো হচ্ছে। এবারের অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার প্রায় ২৫-৩০টি সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল বলে উদ্যোক্তাদের দাবি।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকসহ সদস্যরা জানান, প্রতি বছরই এই ধরনের বার্ষিক কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
‘জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত থাকা’
২০২৬ সালের ১৯তম বার্ষিক অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা—“জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত থাকা।”
অনুষ্ঠানের কর্মসূচিতে ছিল অংশগ্রহণকারী সংগঠনগুলির গোলটেবিল আলোচনা, দলগত কাজের উপস্থাপনা, ‘কনসার্ন’-এর নিজস্ব উপস্থাপনা, BLS প্রশিক্ষণ এবং হুগলির পাঁচটি বিষধর সাপ নিয়ে আলোচনা। পাশাপাশি সাপের কামড় এবং তা প্রতিরোধের বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা হয়।
আয়োজকদের বার্তা, সচেতনতার মাধ্যমেই বদলাতে হবে সাপকে ঘিরে মানুষের পুরনো ধারণা। সাপ দেখলেই মেরে ফেলা নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রশিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমে উদ্ধার করা এবং নিরাপদে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়াই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
কারণ সাপ শুধু একটি প্রাণী নয়—প্রকৃতির ভারসাম্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর সেই প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলেই শেষ পর্যন্ত বাঁচবে মানুষও।
স্থান: পল্লব দাস নগর
আয়োজক: কনসার্ন—প্রকৃতি সংরক্ষণ গবেষণা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সংগঠন
ই-মেইল: [email protected]
ওয়েবসাইট: www.concern.org.,

8697937345











