জমি জালিয়াতির অভিযোগে সিঙ্গুরে ঠিকাদার অর্ণব সিংহ রায় গ্রেফতার, চন্দননগর আদালতে পেশ

Published on: September 13, 2026

জমি জালিয়াতির অভিযোগে সিঙ্গুরে ঠিকাদার অর্ণব সিংহ রায় গ্রেফতার, চন্দননগর আদালতে পেশ

মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি জালিয়াতি করে বিক্রির অভিযোগ, রাজনৈতিক চক্রান্তের দাবি ধৃতের — নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি বিজেপির

সিঙ্গুর: জমি জালিয়াতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে সিঙ্গুরে ফের চাঞ্চল্য। এক ব্যক্তির জমি জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের নামে নথিভুক্ত করে বিক্রি করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ঠিকাদার অর্ণব সিংহ রায়কে গ্রেফতার করেছে সিঙ্গুর থানার পুলিশ। রবিবার তাঁকে চন্দননগর মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়। পুলিশের দায়ের করা মামলায় জামিন অযোগ্য ধারাও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

সিঙ্গুর থানায় অর্ণব সিংহরায়কে চন্দননগর কোর্টে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে, চিত্র : সিঙ্গুর টিভি নিউজ

 

অভিযোগকারীদের দাবি, ঘটনাটি সিঙ্গুর থানার বড়া অঞ্চলের ঝাঁকারি গ্রামের জমি সংক্রান্ত। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই গ্রামের বাসিন্দা তারাপদ মণ্ডল ২০০১ সালে মারা যান। পরিবারের অভিযোগ, তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর, ২০১৪ সালে তাঁর সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেই ঘটনায় অর্ণব সিংহ রায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।

এফ আই কপি, যা কেবলমাত্র সিঙ্গুর টিভি নিউজ পোর্টালের নিজস্ব চিত্র

পরিবারের তরফে আরও দাবি, ২০১৭ সালেই বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তখন তাঁদের অভিযোগের কোনও সুরাহা হয়নি বলে দাবি পরিবারের সদস্যদের। পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের পর তারাপদের এক পুত্র ফের থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্তে নামে পুলিশ। ঘটনায় ইতিমধ্যেই দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই অর্ণব সিংহ রায়কে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।

‘অভিযোগ মিথ্যা, রাজনৈতিক চক্রান্তে ফাঁসানো হয়েছে’, দাবি ধৃতের

অন্যদিকে, আদালতে নিয়ে যাওয়ার সময় অর্ণব সিংহ রায় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং রাজনৈতিক চক্রান্ত করে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।

ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। অর্ণব সিংহ রায়ের সঙ্গে প্রাক্তন মন্ত্রী তথা সিঙ্গুরের প্রাক্তন বিধায়ক বেচারাম মান্না এবং তাঁর স্ত্রী করবী মান্নার ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তুলেছে বিজেপি। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে বেচারাম মান্না বা করবী মান্নার বক্তব্য এই মুহূর্তে পাওয়া যায়নি।

‘২০১৬ সালের পর তাঁকে কোনও রাজনৈতিক মিটিংয়ে দেখিনি’, দাবি পলাশ ঢ্যাংয়ের

প্রাক্তন হরিপালের বিধায়িকা ডাঃ করবী মান্নার সহিত চিত্র

 

অর্ণব সিংহ রায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ প্রসঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের হুগলি-শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলার চেয়ারপার্সন পলাশ ঢ্যাং বলেন, ২০১৬ সালের পর থেকে তাঁকে কোনও মিটিং বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেখেননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অর্ণব মূলত ঠিকাদারি করতেন বলেই তিনি শুনেছেন।

পলাশ ঢ্যাংয়ের বক্তব্যের সারকথা—কোনও ঠিকাদার যদি অপরাধ করে থাকেন, তার দায় ব্যক্তিগত; সেই অভিযোগের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হওয়া উচিত। অর্থাৎ অর্ণবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে দলের রাজনৈতিক অবস্থানকে এক করে দেখা ঠিক নয় বলেই তাঁর বক্তব্যের ইঙ্গিত।

৯০ শতক জমি জালিয়াতির অভিযোগ পরিবারের

স্বমহিমায় অর্ণব সিংহরায়

অভিযোগকারী বিশ্বনাথ মণ্ডলের দাবি, তাঁদের পরিবারের প্রায় ৯০ শতক জমি জালিয়াতি করে বেআইনিভাবে বিক্রি করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, শুধু তাঁদের পরিবার নয়, এলাকায় আরও একাধিক মানুষের জমি নিয়ে একই ধরনের সমস্যা হয়েছে।

বিশ্বনাথের দাবি, তাঁরা তাঁদের জমি ফেরত চান এবং গোটা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি সঞ্জয় পাণ্ডের

অন্যদিকে, জমি জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে সরব হয়েছেন হুগলি সাংগঠনিক জেলা কৃষাণ মোর্চার সভাপতি সঞ্জয় পাণ্ডে। তাঁর দাবি, মৃত ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে তাঁর জমি অন্য ব্যক্তির নামে নথিভুক্ত করে বিক্রি করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ফলে শুধু একজন বা দু’জনকে গ্রেফতার করলেই হবে না, গোটা ঘটনার নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।

সঞ্জয় পাণ্ডের বক্তব্য, তদন্তে যে বা যারাই জড়িত থাকুক, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মদতদাতার ভূমিকা তদন্তে উঠে এলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

জমির রেকর্ডে গরমিলের অভিযোগ

সঞ্জয় পাণ্ডে আরও একটি নির্দিষ্ট জমি সংক্রান্ত অভিযোগ সামনে এনেছেন। তাঁর দাবি, ঝাঁকারি মৌজায় এক ব্যক্তির ৫০ শতাংশ জমি ছিল। ওই ব্যক্তি জমিটি কাউকে বিক্রি করেননি বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীতে রেকর্ডে দেখা যায়, ৫০ শতাংশের মধ্যে ২৪ শতাংশ বাদ দিয়ে বাকি ২৬ শতাংশ জমি অন্যের নামে নথিভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ।

এই বিষয়ে বিডিও-র কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে বলেও দাবি সঞ্জয় পাণ্ডের। তাঁর বক্তব্য, প্রশাসনের তরফে বিষয়টিকে ভুল বা ‘মিসকেস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি নথিতে এমন গরমিল কীভাবে তৈরি হল, তার পিছনে কারও ভূমিকা রয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ, সামনে একাধিক প্রশ্ন

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে আসছে। মৃত ব্যক্তির নামে থাকা সম্পত্তি কীভাবে তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর অন্যের কাছে হস্তান্তরিত হল? জমির নথিতে কোনও জালিয়াতি হয়ে থাকলে তার সঙ্গে আর কারা যুক্ত? রেকর্ডে পরিবর্তন হয়ে থাকলে সেই প্রক্রিয়ায় কোনও সরকারি বা রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছিল কি না—সবকিছুই তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন বলে দাবি উঠছে।

তবে রাজনৈতিক নেতাদের তরফে ওঠা অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের কোনওটিকেই এই মুহূর্তে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না। জমির মালিকানা, নথি জালিয়াতি, হস্তান্তর এবং অভিযুক্তদের ভূমিকা—সবই তদন্তকারী সংস্থার তদন্ত ও আদালতের আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়ার বিষয়।

অর্ণব সিংহ রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও এখনও অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে। আদালতে মামলার শুনানি এবং পুলিশের তদন্তে পরবর্তী সময়ে কী তথ্য সামনে আসে, এখন সেদিকেই নজর।

সিঙ্গুর থেকে সিঙ্গুর টিভি নিউজের বিশেষ প্রতিবেদন।

আজই যোগাযোগ করুন👇
8697937345

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now