তারকেশ্বরে মাসভর ২৪ ঘণ্টার ফ্রি চিকিৎসা শিবির! পুণ্যার্থীদের পাশে চিকিৎসক-সন্ন্যাসীদের মানবসেবা

Published on: August 21, 2026
---Advertisement---

তারকেশ্বরে মাসভর ২৪ ঘণ্টার বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবির

শ্রাবণী মেলায় পুণ্যার্থীদের পাশে মানবসেবার উদ্যোগ, চিকিৎসক-সন্ন্যাসী-সমাজসেবীদের মিলিত প্রয়াস

নিজস্ব সংবাদদাতা, তারকেশ্বর, ২০ আগস্ট:
শ্রাবণ মাসে বাবা তারকনাথের দর্শনে প্রতিদিনই ভিড় জমে তারকেশ্বরে। দূরদূরান্ত থেকে আসা অসংখ্য পুণ্যার্থীর ভিড়ে কখনও অসুস্থ হয়ে পড়েন কেউ, কখনও আবার প্রয়োজন হয় তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসার। সেই সমস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতেই এবার তারকেশ্বর স্টেশন চত্বরে মাসব্যাপী ২৪ ঘণ্টার প্রাথমিক চিকিৎসা পরিষেবা চালু করা হয়েছিল। সম্পূর্ণ বিনামূল্যের এই পরিষেবা শিবির ঘিরে উঠে এল মানবসেবার এক অন্য ছবি।

“সেবা হি পরমো ধর্মঃ”—এই ভাবনাকে সামনে রেখে হুগলির গোঘাটের বামুনিয়া সন্ন্যাস আশ্রম এবং তারকেশ্বর মন্দির কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হয় এই বিশেষ শিবির। সমাজসেবী তথা হাসপাতালের উপদেষ্টা পিনাকী গাঙ্গুলীর উদ্যোগ ও তত্ত্বাবধানে এবং চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তির সহযোগিতায় শ্রাবণ মেলার পুরো এক মাস ধরে চলেছে এই পরিষেবা।

শুধু চিকিৎসা পরিষেবা নয়, এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে পুণ্যার্থীদের স্বাস্থ্য সচেতন করারও চেষ্টা করা হয়েছে। শিবিরে প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি অসুস্থতা নিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল। ফলে তারকেশ্বর স্টেশন চত্বরে পুণ্যার্থীদের ভিড়ের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল এক ভিন্ন পরিবেশ—একদিকে ধর্মীয় আবেগ, অন্যদিকে মানবসেবার বার্তা।

কারা ছিলেন উদ্যোগের সঙ্গে?

শিবিরের সমাপ্তি পর্বে উপস্থিত ছিলেন বামুনিয়া সন্ন্যাস আশ্রমের স্বামী জ্ঞানানন্দ মহারাজ, দার্জিলিং রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী অক্ষই নন্দা মহারাজ, আরপিএফ অফিসার আর. কে. গুপ্তা, গোঘাটের বিধায়কের পরিবারের সদস্যরা, বিশিষ্ট সমাজসেবী তথা আরামবাগ সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সহ-সভাপতি গণেশ চক্রবর্তী এবং শিবভক্ত, সিনিয়র কার্ডিয়াক সার্জেন তথা কলকাতা হার্টল্যান্ড সেন্টারের ডিরেক্টর ডা. অর্ণব মাইতি।

উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন হার্টল্যান্ড সেন্টারের প্রতিনিধিরাও। তাঁদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হৃদরোগ ও ফুসফুসজনিত সমস্যার চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীকে চিকিৎসার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

‘মানব সেবাই মাধব সেবা’

শিবিরের উদ্যোগ প্রসঙ্গে হার্টল্যান্ড সেন্টারের প্রতিনিধি সত্যজিৎ বেহেরা বলেন, মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতি উপলব্ধি করেই মানবসেবার এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পিনাকী গাঙ্গুলীর তত্ত্বাবধানে গত এক মাস ধরে এই সেবামূলক ক্যাম্প পরিচালিত হয়েছে।

চিকিৎসা পরিষেবার ধরন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, হার্টল্যান্ড সেন্টার মূলত কার্ডিয়াক এবং লাং সংক্রান্ত চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত। হৃদযন্ত্র বা ফুসফুসের চিকিৎসা, ইন্টারভেনশন কিংবা সার্জারির পর রোগী যাতে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সেই লক্ষ্যে Cardiopulmonary Rehabilitation-এর উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

রোগী হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরও প্রয়োজন অনুযায়ী Home Care Rehabilitation-এর মাধ্যমে পাশে থাকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তবে চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্পষ্ট করেন সত্যজিৎ বেহেরা। তাঁর কথায়, “সম্পূর্ণ বিনামূল্যে” চিকিৎসা—এভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। হাসপাতালের নির্দিষ্ট নিয়ম ও চিকিৎসা প্রোটোকল মেনেই পরিষেবা দেওয়া হয়। তবে সরকারের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় রোগীরা যে সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সেই সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

‘যতটা পেরেছি পাশে থাকার চেষ্টা করেছি’

এই উদ্যোগে নিজের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন সমাজসেবী গণেশ চক্রবর্তী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আশ্রম, অন্নাশ্রম এবং চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত প্রতিনিধিরাই প্রথম তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর তারকেশ্বর স্টেশনের সামনে হনুমান মন্দির সংলগ্ন এলাকায় শিবির আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

গণেশ চক্রবর্তী বলেন, তাঁকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছেন। কখনও সরাসরি শিবিরে এসে, কখনও প্রয়োজন অনুযায়ী পাশে থেকে উদ্যোগটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আবেগের কথাও। বহু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা থাকলেও এই উদ্যোগে যুক্ত সন্ন্যাসী মহারাজ এবং চিকিৎসকদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছেন, তা তাঁর কাছে বিশেষ স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে জানান তিনি।

আগামী দিনেও এই ধরনের মানবসেবামূলক উদ্যোগে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দেন গণেশ চক্রবর্তী।

‘আগামী বছর আরও জায়গায় হবে’

সেবামূলক এই উদ্যোগের সমাপ্তি পর্বে আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয় মন্ত্রোচ্চারণে। বামুনিয়া সন্ন্যাস আশ্রমের মহারাজ ‘ওঁ অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়’ মন্ত্র উচ্চারণ করে মানবসেবার আদর্শের কথা তুলে ধরেন।

‘জয় বাবা তারকনাথ’ ধ্বনির মধ্য দিয়ে তিনি বলেন, গত এক মাস ধরে তারকনাথ ধামে এই সেবামূলক ক্যাম্প পরিচালনা করতে পেরে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত। সকলের সহযোগিতায় আগামী বছরও তারকেশ্বরে এবং আরও বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের পরিষেবা শিবির আয়োজন করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

শেষে ‘বন্দে মাতরম’ এবং ‘ভারত মাতা কি জয়’ ধ্বনির মধ্য দিয়ে বক্তব্য শেষ করেন মহারাজ।

চিকিৎসকের সতর্কবার্তা—‘উপসর্গকে গ্যাস ভেবে অবহেলা নয়’

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন বিশিষ্ট কার্ডিয়াক সার্জেন ডা. অর্ণব মাইতি। শিবিরে এসে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে দেন হৃদরোগ সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

ডা. মাইতির কথায়, হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখার জন্য শুধু চিকিৎসার উপর নির্ভর করলে হবে না। নিয়মিত হাঁটা, শরীরচর্চা এবং সক্রিয় জীবনযাপনও অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করার চেয়ে রোগ প্রতিরোধের দিকে আগে থেকেই নজর দেওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বুকে ব্যথা প্রসঙ্গে সাধারণ মানুষের একটি প্রচলিত ধারণার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বাম দিকে বুকে ব্যথা হলেই যে সেটি হার্টের সমস্যা, তা নয়। তবে বুকের মাঝখানে চাপধরা ব্যথা, বিশেষ করে হাঁটা বা পরিশ্রমের সময় ব্যথা হওয়া, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা অজ্ঞান হওয়ার মতো অনুভূতি—এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

হার্ট অ্যাটাকের আগে অনেক সময় শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব বা অস্বস্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন চিকিৎসক। এগুলিকে শুধুমাত্র ‘গ্যাসের সমস্যা’ ভেবে দীর্ঘ সময় ফেলে রাখা বিপজ্জনক হতে পারে বলে জানান তিনি।

পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, অথবা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন ডা. মাইতি।

তাঁর বক্তব্য, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়ে। তাই অসুস্থতা দেখা দিলে বাড়িতে বসে সময় নষ্ট না করে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতাল, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের সুবিধার কথাও উঠে এল

হৃদরোগের চিকিৎসার বিপুল খরচের বিষয়টিও তুলে ধরেন ডা. অর্ণব মাইতি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি গুরুতর হৃদরোগের চিকিৎসা অনেক পরিবারের কাছেই আর্থিকভাবে বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই কারণে সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্প এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সুবিধা প্রকৃত প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাপ্য সুবিধা রোগীরা যাতে পান, সে বিষয়ে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলির সহযোগিতার কথাও জানান তিনি।

বিধায়কের পরিবারের উপস্থিতি

এই উদ্যোগে উপস্থিত ছিলেন গোঘাটের বিধায়কের পরিবারের সদস্যরাও। বিধায়কের বোন মৌসুমী চাঁদ জানান, ব্যবসায়িক ব্যস্ততার কারণে তাঁর দাদা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি। তাই তিনি বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠানে এসেছেন।

মৌসুমীর কথায়, এই ধরনের মানবিক পরিষেবা শিবিরে এসে তাঁর অত্যন্ত ভালো লেগেছে। আগামী বছরও যেন এই উদ্যোগ চালু থাকে এবং আরও বিভিন্ন জায়গায় এমন পরিষেবা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, সেই প্রার্থনাও জানান তিনি। একইসঙ্গে ভবিষ্যতেও এই ধরনের উদ্যোগে পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

ধর্মীয় তীর্থে মানবসেবার বার্তা

তারকেশ্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্রে শ্রাবণ মাসে লক্ষাধিক মানুষের আনাগোনা হয়। সেই ভিড়ের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়া বা প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সেই জায়গায় টানা এক মাস ২৪ ঘণ্টার প্রাথমিক চিকিৎসা পরিষেবা চালু রাখা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি মানবসেবাকেও সামনে রেখে আয়োজিত এই শিবিরে এক মঞ্চে দেখা গেল সন্ন্যাসী, চিকিৎসক, সমাজসেবী, প্রশাসনিক কর্মী এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের। উদ্যোক্তাদের দাবি, এটি কেবল একটি চিকিৎসা শিবির নয়—মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি ধারাবাহিক প্রয়াস।

এবং সেই কারণেই সমাপ্তির দিন থেকেই পরের বছরের পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে। তারকেশ্বরের গণ্ডি পেরিয়ে আগামী দিনে আরও জায়গায় এই ধরনের স্বাস্থ্য ও মানবসেবামূলক উদ্যোগ পৌঁছে দেওয়াই এখন আয়োজকদের লক্ষ্য।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now