গাড়ি চলাচলে বাধা, হুমকি ও বাবাকে মারধরের অভিযোগ
২৩ আগস্টের উত্তেজনার পর ২৪ আগস্ট পুলিশ সুপারের দ্বারস্থ অভীক মণ্ডল
সিঙ্গুর টিভি নিউজ ওয়েবডেস্ক, ২৭ আগস্ট: গাড়ি চলাচলে বাধা, গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত করার হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং তাঁর বাবাকে মারধরের অভিযোগ ঘিরে সিঙ্গুরে উত্তেজনার আবহ। পরিস্থিতির নিরপেক্ষ তদন্ত ও পরিবারের নিরাপত্তার দাবিতে ২৪ আগস্ট হুগলি জেলা পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ২ নম্বর রতনপুরের বাসিন্দা অভীক মণ্ডল।
অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, সমস্যার সূত্রপাত ১৮ আগস্ট। তাঁর গাড়ি কয়েকজন অটো ও ই-রিকশা চালক আটকে দেন বলে অভিযোগ। গাড়িটি অননুমোদিতভাবে চলাচল করছে বলে দাবি করা হলেও, তিনি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন-সহ বৈধ নথিপত্র দেখাতে প্রস্তুত ছিলেন বলে দাবি করেছেন। কিন্তু সেই নথি গ্রহণ না করে তাঁকে গাড়ি চালাতে দেওয়া হবে না বলে চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ।
অভিযোগ, ওই সময় তাঁর গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত করে পুকুরে ফেলে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান।
এরপর একই দিনে রতনপুরের কল্পনা সিনেমা হলের কাছে তাঁর বাবা বাবলু মণ্ডলকে কয়েকজন ব্যক্তি ঘিরে ধরে মারধর ও হয়রানি করেছেন বলে অভিযোগ করেন অভীক। অভিযোগপত্রে হীরা ওরফে শেখ নাসিমুদ্দিন নামে এক ব্যক্তির ভূমিকা থাকার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটির CCTV ফুটেজ রয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারী। তদন্তের প্রয়োজনে সেই ফুটেজ পুলিশকে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
তবে ঘটনার পর পরিস্থিতি মীমাংসার চেষ্টা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ অভীকের।
২৩ আগস্ট ফের উত্তেজনা
অভিযোগকারীর বক্তব্য, ২৩ আগস্ট পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তাঁর গাড়ি চলাচল নিয়ে একাধিক টোটোচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় বলে অভিযোগ। এমনকি একটি সময়ে বহু মানুষ একত্রিত হয়ে তাঁর গাড়ি আটক করে চাপ সৃষ্টি করেন বলেও দাবি তাঁর।
অভীক মণ্ডলের অভিযোগ, এই ঘটনায় প্রায় ৭০–৮০ জনের একটি দল জড়ো হয়েছিল। ঘটনায় জড়িত বলে সন্দেহভাজন কয়েকজনের ছবি ও অন্যান্য তথ্য তাঁর কাছে রয়েছে বলেও তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন।
এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই উঠে এসেছে টোটো চলাচল নিয়ন্ত্রণের সাম্প্রতিক সরকারি নির্দেশিকার প্রসঙ্গ।
হাইওয়েতে টোটো চলাচল নিয়ে রাজ্যের কড়া নির্দেশ
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ পরিবহণ দফতর পুলিশকে জাতীয় ও রাজ্য সড়ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কে টোটো বা ই-রিকশার অননুমোদিত চলাচল বন্ধ করতে কড়া নির্দেশ দিয়েছে। ৭ আগস্ট ২০২৬-এর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ই-রিকশা মূলত স্থানীয় বা ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’-র জন্য ব্যবহারের কথা এবং নির্দিষ্ট স্থানীয় রাস্তায় তাদের চলাচল অনুমোদিত। জাতীয় ও রাজ্য সড়ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজ্য সরকারের আগের নির্দেশিকাতেও গ্রামীণ ও ছোট শহর এলাকায় ই-রিকশাকে জাতীয় ও রাজ্য মহাসড়ক এবং বাস পরিষেবা চলাচল করে এমন অন্যান্য প্রধান সড়কে না চালানোর কথা উল্লেখ ছিল। রুট ও চলাচলের এলাকা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট RTA-র সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়ের মাধ্যমে করার কথাও বলা হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে অভিযোগকারীর প্রশ্ন, সরকারি নির্দেশিকা কার্যকর করার ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে বাস্তবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? কোন রাস্তায় টোটো চলবে, কোন রাস্তায় চলবে না এবং নির্ধারিত রুট কে বা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে—এই বিষয়গুলিতে প্রশাসনের স্পষ্ট ভূমিকা থাকা জরুরি বলে দাবি তাঁর।
তবে কোনও নির্দিষ্ট রাস্তা, যেমন তারকেশ্বর রোড, ওই নির্দেশিকার আওতায় ঠিক কোন শ্রেণির সড়ক হিসেবে পড়ছে এবং সংশ্লিষ্ট টোটোর নির্দিষ্ট পারমিটে কী রুট অনুমোদিত রয়েছে—তা সংশ্লিষ্ট পরিবহণ কর্তৃপক্ষের নথি ও তদন্তের ভিত্তিতেই নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
‘আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চাই না’
অভীক মণ্ডল তাঁর লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন, তিনি কোনও সংঘর্ষে জড়াতে চান না এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ারও কোনও ইচ্ছা নেই। পুলিশের উপর আস্থা রেখেই শান্তিপূর্ণভাবে আইন মেনে গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে চান তিনি।
তাঁর দাবি, গাড়িটির উপর ঋণ রয়েছে এবং গাড়িটি তাঁর পরিবারের জীবিকার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ফলে বারবার গাড়ি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে তাঁর উপার্জন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি পরিবারও আর্থিক সমস্যায় পড়তে পারে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিরোধের সময় কয়েকজন ব্যক্তি উসকানিমূলক ও কথিত সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করেছেন। এই ধরনের মন্তব্যের ফলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
পুলিশের কাছে একাধিক দাবি
২৪ আগস্ট পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে অভীক মণ্ডল গোটা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, CCTV ফুটেজ সংগ্রহ ও পরীক্ষা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং তাঁর গাড়ির বৈধ নথি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
পাশাপাশি গাড়ি চলাচলে বেআইনি বাধা, হুমকি, হয়রানি এবং তাঁর বাবার উপর কথিত হামলার অভিযোগ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন তিনি।
তাঁর ও পরিবারের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় পুলিশি ব্যবস্থা, এলাকায় নজরদারি ও টহল বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট থানাকে দ্রুত পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়ার আবেদনও জানানো হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে শ্রী সুনীল ও শ্রী বিধান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন অভীক।
এখন মূল প্রশ্ন, সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী টোটোর রুট ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয় এবং একই সঙ্গে গাড়ি আটকে দেওয়া, হুমকি ও মারধরের যে অভিযোগ উঠেছে, তার তদন্ত কত দ্রুত হয়।
তবে অভীক মণ্ডলের অভিযোগে ওঠা প্রতিটি বিষয়ের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। অভিযোগে নাম থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং পুলিশ প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এই মুহূর্তে পাওয়া যায়নি।

8697937345











