মাত্র আড়াই সেন্টিমিটারে মা দুর্গা! ডাল-চাল ও মশলায় অনন্য সৃষ্টি মগরাহাটের শিল্পী গৌরাঙ্গ মণ্ডলের
দক্ষিণ ২৪ পরগনা: দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মহালয়ার ভোরে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। আর সেই শুভ মুহূর্তকে কেন্দ্র করেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাট থেকে উঠে এল এক অভিনব শিল্পকর্মের কথা। ডাল, চাল, লবঙ্গ, এলাচ ও বিভিন্ন গরম মশলার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করে মাত্র আড়াই সেন্টিমিটারের মধ্যে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করেছেন শিল্পী গৌরাঙ্গ মণ্ডল। তাঁর এই ক্ষুদ্র সৃষ্টি শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা, ধৈর্য এবং সৃজনশীলতার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে নজর কেড়েছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণেই দেবীর আগমনী
সাধারণত দুর্গাপ্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে মাটি, খড়, বাঁশ, রং এবং অন্যান্য শিল্পসামগ্রী ব্যবহার করা হয়। কিন্তু গৌরাঙ্গ মণ্ডলের এই শিল্পকর্মের বিশেষত্ব হল, তিনি দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণকে কাজে লাগিয়ে দেবী দুর্গার প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তুলেছেন। ডাল ও চালের মতো পরিচিত খাদ্যশস্যের পাশাপাশি লবঙ্গ, এলাচ এবং গরম মশলার ব্যবহার তাঁর সৃষ্টিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
মাত্র আড়াই সেন্টিমিটারের মধ্যে দেবীর অবয়ব, একাধিক হাত, অস্ত্র এবং প্রতিমার অন্যান্য অংশ ফুটিয়ে তোলা নিঃসন্দেহে সূক্ষ্ম কাজের পরিচয় বহন করে। এত ছোট পরিসরে প্রতিমার বিভিন্ন অংশের আকার, গঠন ও রংয়ের সামঞ্জস্য বজায় রাখা শিল্পীর কাছে যথেষ্ট মনোযোগ ও ধৈর্যের বিষয়।
ক্ষুদ্র পরিসরে বড় শিল্পভাবনা
শিল্পের জগতে বড় ক্যানভাস বা দামি উপকরণই যে সৃষ্টির একমাত্র মাধ্যম নয়, এই ধরনের কাজ সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। কখনও সামান্য উপকরণ, কখনও দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত সামগ্রীও শিল্পীর কল্পনায় হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ সৃষ্টির উপাদান। গৌরাঙ্গ মণ্ডলের এই দুর্গাপ্রতিমাও সেই ভাবনার একটি দৃষ্টান্ত।
প্রতিমাটির আকার অত্যন্ত ছোট হওয়ায় এর সূক্ষ্ম অংশগুলি তৈরি করতে বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন। দেবীর মুখের অভিব্যক্তি, অলংকারের মতো অংশ, হাতের বিন্যাস এবং সিংহ ও অসুরের অবয়বকে ক্ষুদ্র পরিসরে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা শিল্পকর্মটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। হাতের তালুতে রাখা প্রতিমাটির ছবিতেই বোঝা যায়, কতটা ছোট আকারের মধ্যে পুরো দৃশ্যটি সাজানো হয়েছে।
মহালয়ার আবহে শিল্পীর বিশেষ উদ্যোগ
মহালয়া বাঙালির কাছে শুধু একটি তিথি নয়, দেবীপক্ষের সূচনার আবেগঘন মুহূর্ত। ভোরের চণ্ডীপাঠ, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী এবং দেবীর আগমনী সুরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক স্মৃতি। সেই আবহে দেবী দুর্গাকে কেন্দ্র করে শিল্পীর এই ক্ষুদ্র সৃষ্টি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
শিল্পী গৌরাঙ্গ মণ্ডল জানিয়েছেন, মহালয়ার পূর্ণলগ্নে ডাল, চাল, লবঙ্গ, গরম মশলা ও এলাচ ব্যবহার করে তিনি এই দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করেছেন। তাঁর আবেদন, সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে তাঁর এই ছোট্ট প্রচেষ্টাকে মানুষের সামনে তুলে ধরা হোক। তাঁর শিল্পকর্ম আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছলে তিনি কৃতজ্ঞ থাকবেন বলেও জানিয়েছেন।
স্থানীয় শিল্পীদের কাজ তুলে ধরার গুরুত্ব
বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বহু শিল্পী নিজেদের উদ্যোগে নানা ধরনের ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম তৈরি করেন। কেউ মাটি দিয়ে, কেউ কাঠ দিয়ে, আবার কেউ কাগজ, শস্যদানা কিংবা অপ্রচলিত উপকরণ ব্যবহার করে নিজের ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেন। তাঁদের অনেকের কাজ বৃহত্তর পরিসরে পরিচিতি পাওয়ার সুযোগ পায় না। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে এমন সৃজনশীল উদ্যোগের কথা মানুষের সামনে তুলে ধরলে শিল্পীদের কাজ সম্পর্কে আগ্রহ বাড়তে পারে।
তবে কোনও শিল্পকর্মের বিশেষত্ব তুলে ধরার ক্ষেত্রে তথ্যের যথার্থতা বজায় রাখাও জরুরি। গৌরাঙ্গ মণ্ডলের তৈরি প্রতিমার আকার আড়াই সেন্টিমিটার বলে শিল্পীর দাবি রয়েছে। এই মাপের স্বতন্ত্র যাচাই বা কোনও রেকর্ড সংস্থার স্বীকৃতির তথ্য পাওয়া না যাওয়ায় এটিকে কোনও বিশ্বরেকর্ড বা সর্বকনিষ্ঠ প্রতিমা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে না। বরং তাঁর সৃষ্টির অভিনব উপকরণ, ক্ষুদ্র আকার এবং শিল্পভাবনাকেই প্রতিবেদনের মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
শিল্পের প্রতি ভালোবাসাই সৃষ্টির প্রেরণা
গৌরাঙ্গ মণ্ডলের এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, শিল্পের মূল্য শুধু তার আকার বা ব্যবহৃত উপকরণের দাম দিয়ে বিচার করা যায় না। শিল্পীর কল্পনা, পরিশ্রম এবং একটি ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার আন্তরিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র আড়াই সেন্টিমিটারের এই দুর্গাপ্রতিমা সেই সৃজনশীলতারই একটি ছোট অথচ উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটের শিল্পী গৌরাঙ্গ মণ্ডলের এই প্রচেষ্টা কতটা মানুষের কাছে পৌঁছবে, তা সময়ই বলবে। তবে মহালয়ার আবহে নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে দেবী দুর্গার এমন ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি তৈরি করে তিনি নিজের শিল্পভাবনাকে সামনে এনেছেন। তাঁর এই সৃজনশীল উদ্যোগের জন্য রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা।
শিল্পী: গৌরাঙ্গ মণ্ডল
স্থান: মগরাহাট, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
প্রতিবেদন: সিঙ্গুর টিভি নিউজ












