হরিপালে নজিরবিহীন কর্মী সম্মেলন! ৩০১টি বুথের কর্মীদের এক ছাদের তলায় এনে সম্প্রীতির বার্তা বিধায়ক মধুমিতা ঘোষের, প্রায় ৫৫০ জনের মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন
নিজস্ব প্রতিনিধি, হরিপাল, হুগলী :
শুধু রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রী কিংবা প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে নয়, দলের বুথ স্তরের কর্মী ও সংগঠকদের নিয়েই সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে এক বিশাল বিজয় সম্মেলনীর আয়োজন করলেন হরিপালের বিধায়ক মধুমিতা ঘোষ। হরিপাল বিধানসভার ৩০১টি বুথের কর্মী-সমর্থকদের এক ছাদের তলায় নিয়ে এসে তৈরি হল এক অন্যরকম রাজনৈতিক মিলনমেলার পরিবেশ। সঙ্গে ছিল বিপুল মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন।
রাজনীতির ময়দানে নির্বাচনী জয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ সেই জয়ের পিছনে থাকা কর্মীদের সম্মান ও তাঁদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। কারণ, রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তির প্রকৃত ভিত তৈরি হয় বুথ স্তর থেকেই। আর সেই বুথ স্তরের কর্মীদের গুরুত্ব দিয়ে এবার এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগের সাক্ষী থাকল হুগলি জেলার হরিপাল বিধানসভা।
হরিপালের বিধায়ক মধুমিতা ঘোষের উদ্যোগে আয়োজিত হল এক বিশাল বিজয় সম্মেলনী অনুষ্ঠান। যেখানে মূল আকর্ষণ ছিল হরিপাল বিধানসভার ৩০১টি বুথের কর্মী ও সংগঠকদের একত্রিত করা। বিধানসভা এলাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলের কর্মী-সমর্থকরা এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। দলীয় সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কার্যত এক বৃহৎ সাংগঠনিক মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয় গোটা অনুষ্ঠানস্থল।
এই আয়োজনের বিশেষত্ব ছিল এর পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণকারীদের নির্বাচন। সাধারণত রাজনৈতিক বিজয় সম্মেলনী কিংবা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক আধিকারিক এবং বিভিন্ন স্তরের অতিথিদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। কিন্তু হরিপালের বিধায়ক মধুমিতা ঘোষের এই আয়োজনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দলের নিজস্ব কর্মী ও সংগঠকরা। বুথ স্তর থেকে শুরু করে মণ্ডল স্তর এবং বিভিন্ন মোর্চার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিয়ে সাজানো হয়েছিল এই সম্মেলনীর আয়োজন।
জানা গিয়েছে, এই অনুষ্ঠানে মণ্ডল সভাপতি থেকে শুরু করে যুব মোর্চা, মহিলা মোর্চা, তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি এবং ওবিসি মোর্চার বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্ব ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি বুথ সভাপতি, বুথ স্তরের সংগঠক এবং শক্তিকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদেরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হরিপাল বিধানসভা এলাকার চারটি মণ্ডলের মণ্ডল সভাপতিরা এই অনুষ্ঠানের অংশ ছিলেন। পাশাপাশি চারজন যুব মোর্চার সভাপতি, চারজন মহিলা মোর্চার সভাপতি এবং এসসি, এসটি ও ওবিসি মোর্চার বিভিন্ন মণ্ডল স্তরের সভাপতিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর পাশাপাশি প্রায় ৩০১টি বুথের প্রতিনিধিদের উপস্থিতির কথাও উঠে এসেছে আয়োজকদের বক্তব্যে। সব মিলিয়ে সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিদের একত্রিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
তবে এই অনুষ্ঠানের ব্যাপ্তি শুধুমাত্র কয়েকজন পদাধিকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আয়োজকদের হিসেব অনুযায়ী, সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচশো মানুষের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল। অর্থাৎ সংখ্যার নিরিখেও এই সম্মেলনী ছিল যথেষ্ট বড় মাপের। দূরদূরান্ত থেকে আসা কর্মী-সমর্থকদের জন্য ছিল মধ্যাহ্নভোজের বিশেষ ব্যবস্থা। রাজনৈতিক আলোচনা, সাংগঠনিক পরিচিতি এবং পারস্পরিক মতবিনিময়ের পাশাপাশি একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়ার মধ্য দিয়েও তৈরি হয় এক আন্তরিক পরিবেশ।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই ধরনের আয়োজনের মধ্যে দিয়ে দলের বুথ স্তরের কর্মীদের সঙ্গে নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়। অনেক সময় দলের উচ্চস্তরের নেতৃত্বের সঙ্গে বুথ স্তরের কর্মীদের দূরত্ব তৈরি হয়। সাংগঠনিক ব্যস্ততা কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচির চাপে নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগও কমে যায়। সেই জায়গা থেকে এই ধরনের সম্মেলনী কর্মীদের মনোবল বাড়াতে এবং সংগঠনের ভিত আরও মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এই অনুষ্ঠানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, আয়োজনের ক্ষেত্রে বিধায়ক মধুমিতা ঘোষের পৃথক ভাবনা। সাধারণত বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেখা যায়, জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি প্রশাসনিক স্তরের বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় বিশিষ্টজন কিংবা বাইরের অতিথিদের উপস্থিতি থাকে। কিন্তু এই সম্মেলনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল দলের নিজস্ব সাংগঠনিক পরিবারকে একত্রিত করা। অর্থাৎ যাঁরা বুথে বুথে সংগঠনের কাজ করেন, যাঁরা মানুষের কাছে দলের বার্তা পৌঁছে দেন, যাঁরা নির্বাচনের সময় মাঠে নেমে দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের নিয়েই এই আয়োজন।
এখানেই অন্যদের থেকে এই উদ্যোগের স্বাতন্ত্র্য বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। কারণ, নির্বাচনে জয়লাভের পর অনেক ক্ষেত্রেই বিজয় উদযাপন ঘিরে বড় মাপের অনুষ্ঠান হয়। সেখানে মঞ্চের আলো, বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতি কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যই হয়ে ওঠে প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু হরিপালের এই সম্মেলনীতে গুরুত্ব পেয়েছে সংগঠনের ভিত তৈরি করা কর্মীরা। তাঁদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাঁদের একত্রিত করা এবং তাঁদের সম্মান জানানোর ভাবনাই ছিল
রাজনীতিতে জনপ্রতিনিধির সাফল্য কেবল বিধানসভায় বক্তব্য রাখা কিংবা সরকারি উন্নয়নমূলক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দলের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, তাঁদের অভাব-অভিযোগ শোনা এবং সংগঠনের প্রতিটি স্তরের মানুষের পাশে থাকা—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বুথ স্তরের কর্মীরাই নির্বাচনের সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠেন। তাঁদের পরিশ্রমের উপর নির্ভর করে অনেকাংশেই দলের সাংগঠনিক সাফল্য।
সেই জায়গা থেকেই মধুমিতা ঘোষের এই উদ্যোগকে একটি সাংগঠনিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিধানসভার ৩০১টি বুথকে একই সাংগঠনিক ছাতার তলায় আনার ভাবনা, বিভিন্ন মোর্চার প্রতিনিধিদের এক মঞ্চে নিয়ে আসা এবং প্রায় সাড়ে পাঁচশো মানুষের জন্য মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে আয়োজনের পরিসর ছিল উল্লেখযোগ্য।
এই সম্মেলনী শুধু একটি বিজয় উদযাপনের অনুষ্ঠান নয়, বরং দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও ঐক্যের পরিবেশ তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানে যাঁরা সামনে থেকে দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের সঙ্গে নেতৃত্বের এই সরাসরি যোগাযোগ আগামী দিনে সংগঠনের কাজেও কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।
সব মিলিয়ে হরিপালের বিধায়ক মধুমিতা ঘোষের এই বিজয় সম্মেলনীতে উঠে এল একটি বিশেষ বার্তা—রাজনীতির আসল শক্তি শুধু মঞ্চে থাকা নেতৃত্ব নয়, বরং মাঠে-ময়দানে কাজ করা সেই কর্মীরাও, যাঁদের হাত ধরে সংগঠন মানুষের দরজায় পৌঁছয়। আর সেই কর্মীদের এক ছাদের তলায় এনে সম্মান জানানোর মধ্য দিয়েই হরিপালে তৈরি হল এক অন্যরকম রাজনৈতিক মিলনমেলার ছবি।।





