বিজেপির ক্ষমতায় আসার নেপথ্যে কর্মীদের আত্মত্যাগ, মন্ত্রীদের উদ্দেশে বার্তা—দুর্দিনের সৈনিকদের ভুলে গেলে চলবে না

Published on: October 30, 2026

ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছে অতীত ভুলে গেলে চলবে না, কর্মীদের আত্মত্যাগের মর্যাদা দিতে শিখুন

রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। আজ যে দল ক্ষমতায় রয়েছে, আগামী দিনে অন্য কোনও দল ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার এই পালাবদলের মধ্যেও কিছু বিষয় কখনও বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে, একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে প্রতিষ্ঠিত করতে যাঁরা বছরের পর বছর লড়াই করেছেন, প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের পতাকা হাতে রাস্তায় নেমেছেন, রাজনৈতিক হিংসা, নির্যাতন, অপমান ও আক্রমণের শিকার হয়েছেন, তাঁদের অবদান কোনওভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

আজ বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে। এই রাজনৈতিক সাফল্যের পিছনে শুধু বড় বড় নেতাদের বক্তব্য, সভা, মিছিল কিংবা নির্বাচনী কৌশলই কাজ করেনি। এর পিছনে রয়েছে অসংখ্য সাধারণ কর্মীর নিরলস পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং দীর্ঘদিনের সংগ্রাম। এমন অনেক কর্মী রয়েছেন, যাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন, সংসার, আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক সম্মানকে উপেক্ষা করে দলের জন্য কাজ করেছেন। কেউ রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন, কেউ মার খেয়েছেন, কেউ বাড়িঘর ছেড়ে থাকতে বাধ্য হয়েছেন, আবার কেউ প্রাণ পর্যন্ত হারিয়েছেন। তাঁদের পরিবারের যন্ত্রণা, তাঁদের স্বজনদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং তাঁদের অসমাপ্ত স্বপ্নের মূল্য কি শুধুই নির্বাচনী ফলাফলের পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে?

আজ যাঁরা মন্ত্রী, বিধায়ক কিংবা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের মনে রাখা প্রয়োজন, ক্ষমতার চেয়ারে বসার পিছনে বহু মানুষের অবদান রয়েছে। রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়ে যাঁরা পাশে ছিলেন, যাঁরা সংগঠনকে ধরে রেখেছিলেন, যাঁরা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও পিছিয়ে যাননি, তাঁদের সম্মান দেওয়া নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব।

অতীতের রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও হিংসার ঘটনাগুলি মনে রাখা জরুরি। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কর্মীদের উপর হামলা, দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর, গাড়ি ভাঙচুর এবং শারীরিক আক্রমণের মতো ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছে। সেই সময় যাঁরা আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজও সেই অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের ক্ষত হয়তো বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু সেই স্মৃতি তাঁদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেই সেই ইতিহাস মুছে যায় না।

বিশেষ করে, বিজেপির দুর্দিনে যাঁরা সংগঠনের পাশে ছিলেন, তাঁদের অবদান নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। শুধু নির্বাচনের সময় তাঁদের খোঁজ নেওয়া কিংবা মঞ্চে তাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

একই সঙ্গে বর্তমান নেতৃত্বের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতেই হয়—যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য লড়াই করেছেন, তাঁরা কি আজ যথাযথ সম্মান পাচ্ছেন? নাকি ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন পরিচিত মুখ, নতুন সুবিধাভোগী এবং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিরাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন? এই প্রশ্ন কোনও একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং রাজনৈতিক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধ ও দায়বদ্ধতা নিয়ে।

রাজনীতিতে নতুন মানুষ আসবেন, নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে, নতুন প্রজন্ম দায়িত্ব গ্রহণ করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নতুনদের স্বাগত জানাতে গিয়ে পুরনো সৈনিকদের অবদান অস্বীকার করা কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ, যে সংগঠন নিজের পুরনো কর্মীদের সম্মান দিতে জানে না, সেই সংগঠনের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও ভুল বার্তা পৌঁছায়।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে মতাদর্শগত বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিরোধ কখনও ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা কিংবা হিংসার কারণ হওয়া উচিত নয়। গণতন্ত্রে বিরোধী মতের সম্মান থাকা আবশ্যক। অতীতে যাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের বিচার ও ন্যায়বিচারের দাবি আইনসম্মত পথে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। কোনও অপরাধের বিচার ব্যক্তিগত প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়, আইনের মাধ্যমে হওয়াই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি।

মন্ত্রিত্ব কোনও ব্যক্তিগত পুরস্কার নয়; এটি মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অবস্থান। তাই যাঁরা আজ প্রশাসনিক ক্ষমতায় রয়েছেন, তাঁদের কথাবার্তা, আচরণ এবং সিদ্ধান্তে সংযম ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে, দলের সাধারণ কর্মীদের আবেগ, তাঁদের আত্মত্যাগ এবং তাঁদের প্রত্যাশাকে সম্মান করা জরুরি।

মনে রাখতে হবে, নির্বাচনে জয়লাভ একটি রাজনৈতিক সাফল্য, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস অর্জন একটি দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব। সেই বিশ্বাস ধরে রাখতে হলে কর্মীদের সম্মান দিতে হবে, সাধারণ মানুষের কথা শুনতে হবে এবং অতীতের সংগ্রামের ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে।

আজ যাঁরা ক্ষমতায়, তাঁদের কাছে প্রত্যাশা একটাই—দুর্দিনের সহযোদ্ধাদের ভুলে যাবেন না। যাঁরা পাশে ছিলেন, তাঁদের পাশে থাকুন। যাঁরা হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের খোঁজ নিন। যাঁরা এখনও অবহেলিত, তাঁদের সম্মান ফিরিয়ে দিন।

কারণ, রাজনৈতিক ইতিহাস শুধু ক্ষমতায় আসা নেতাদের নাম দিয়ে লেখা হয় না। সেই ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় লেখা থাকে অসংখ্য নামহীন কর্মীর সংগ্রাম, ত্যাগ, অশ্রু এবং আত্মবলিদানের কাহিনি।

ক্ষমতা সাময়িক, পদ সাময়িক, রাজনৈতিক সমীকরণও সাময়িক। কিন্তু মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস চিরস্থায়ী। যে নেতৃত্ব এই ইতিহাসকে সম্মান করতে জানে, প্রকৃত অর্থে সেই নেতৃত্বই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে।

অতএব, ক্ষমতার অহংকার নয়, কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতাই হোক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয়।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now