পুরশুড়ায় কৃষক সভা থেকে একাধিক বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর, ২০ লক্ষেরও বেশি উপভোক্তাকে দ্বিতীয় কিস্তির টাকা দেওয়ার বার্তা
হুগলি: হুগলির পুরশুড়ায় কৃষকদের সভা থেকে রাজ্য সরকারের একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ও উন্নয়নমূলক কাজের খতিয়ান তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। খাদ্যসামগ্রী বণ্টন থেকে শুরু করে ১২৫ দিনের কর্মসংস্থান, পশ্চিমবঙ্গ আবাস যোজনা, আয়ুষ্মান ভারত—একাধিক বিষয় নিয়ে বক্তব্য রাখেন তিনি। পাশাপাশি আবাস যোজনার দ্বিতীয় কিস্তির টাকা প্রদানের সময়সীমা জানিয়ে উপভোক্তাদের উদ্দেশে বড় বার্তাও দেন মুখ্যমন্ত্রী।

সভামঞ্চ থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রথমেই রাজ্যের রেশন ব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আগে সরকার প্রতি সপ্তাহে উপভোক্তাদের এক কেজি চিনি, এক কেজি ময়দা এবং ৫০০ গ্রাম করে সুজি দিত। বর্তমানে রাজ্যের প্রায় আট কোটি উপভোক্তা সরকারের তরফে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী ও পরিষেবার সুবিধা পাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এরপর কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, পুরনো ও নতুন মিলিয়ে মোট ২ কোটি ১৩ লক্ষ জব কার্ড দেওয়া হয়েছে। সেই জব কার্ডধারীদের ১২৫ দিনের কাজ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন তিনি। গ্রামীণ এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান এবং আর্থিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এরপর রাজ্যের আবাসন প্রকল্পের নাম পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগে যে প্রকল্পটি ‘বাংলার বাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল, তার নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘পশ্চিমবঙ্গ আবাস যোজনা’।
এই নাম পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, আগের সরকার পশ্চিমবঙ্গ নামটিকে তুলে দিতে চেয়েছিল। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গ নামের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং দেশভাগের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। সেই ইতিহাসকে স্মরণে রাখতেই তাঁর সরকার প্রকল্পটির নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ আবাস যোজনা’ রেখেছে বলে জানান তিনি।
আবাস যোজনার প্রথম কিস্তির টাকা পাওয়া উপভোক্তাদের দ্বিতীয় কিস্তি নিয়ে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, সেই প্রসঙ্গেও মুখ খোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রথম কিস্তির টাকা পাওয়ার পর অনেক উপভোক্তাকে ভয় দেখানো হয়েছিল যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে তাঁরা আর দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পাবেন না।
এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, তাঁর সরকার উপভোক্তাদের দ্বিতীয় কিস্তির টাকা দেওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই প্রথম পর্যায়ে ১০ লক্ষ ২০ হাজার উপভোক্তাকে দ্বিতীয় কিস্তির ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ প্রদানের সময় তিনি নিজে এবং পঞ্চায়েত মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন বলেও জানান।
তবে এখানেই শেষ নয়। আগামী ১৩ তারিখে আরও সাত লক্ষ উপভোক্তাকে দ্বিতীয় কিস্তির টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, যাঁদের ভেরিফিকেশন বা যাচাইয়ের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, তাঁরাই এই পর্যায়ে টাকা পাবেন।
এদিন সভামঞ্চ থেকে তিনি বলেন, কালীপুজোর ছুটি শেষ হওয়ার পর আগামী ১৩ তারিখ সকাল ১১টায় সংশ্লিষ্ট উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে দ্বিতীয় কিস্তির ৬০ হাজার টাকা সরাসরি ট্রান্সফার করা হবে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য পঞ্চায়েত মন্ত্রী এবং পুরমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা হবে বলেও জানান তিনি।
এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আবাস যোজনার উপভোক্তাদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষত যাঁরা প্রথম কিস্তির টাকা পেয়েছেন অথচ দ্বিতীয় কিস্তির অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁদের কাছে মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
এরপর স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, রাজ্যে ইতিমধ্যেই চার কোটি ২০ লক্ষ মানুষ আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের কার্ড পেয়েছেন বলে তাঁর দাবি। স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও বক্তব্যে তুলে ধরেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত রাজ্যে ২ লক্ষ ২০ হাজার মানুষ আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসার সুবিধা পেয়েছেন। চিকিৎসা পরিষেবা গ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা উল্লেখ করে তিনি প্রকল্পটির গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেন।
সভায় বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত আরও কিছু তথ্য তুলে ধরতে গিয়ে তিনি জুলাই মাসের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তবে সেই অংশের বক্তব্য অসম্পূর্ণ থাকায় এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য স্পষ্ট নয়।

সব মিলিয়ে পুরশুড়ার কৃষক সভা থেকে খাদ্যসামগ্রী বণ্টন, কর্মসংস্থান, আবাসন প্রকল্প এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা—একাধিক বিষয়কে সামনে রেখে রাজ্য সরকারের কাজের খতিয়ান তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে আবাস যোজনার দ্বিতীয় কিস্তির টাকা প্রদানের নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় ঘোষণা করে উপভোক্তাদের আশ্বস্ত করার বার্তা দেন তিনি।
উল্লেখ্য: এই প্রতিবেদনে মুখ্যমন্ত্রীর সভায় দেওয়া বক্তব্য ও পরিসংখ্যান তাঁর দাবি হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও প্রকল্পের তথ্যের সঙ্গে তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।









