রাতে গ্রেফতারি, দিনে জামিন! ‘হচ্ছেটা কী?’—উত্তম কুণ্ডু-কাণ্ডে প্রশ্নের পর প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিনিধি, হুগলি, ২০ আগস্ট:
রাতে গ্রেফতারি। পর দিনই জামিন। তা হলে উত্তম কুণ্ডুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি কি আদৌ গুরুতর ছিল? নাকি অভিযোগ গুরুতর হলেও তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপে তার প্রতিফলন দেখা গেল না? তারকেশ্বরের রাজনৈতিক মহলে এখন ঘুরছে এমনই একাধিক প্রশ্ন।
কোটি টাকার আর্থিক প্রতারণা, তোলাবাজি, জমি দখল এবং নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাট জবরদখলের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বুধবার রাতে কলকাতা থেকে গ্রেফতার করা হয় তারকেশ্বরের প্রাক্তন পুরপ্রধান তথা তৃণমূলের আরামবাগ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি উত্তম কুণ্ডুকে। ২৫ জুন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
বৃহস্পতিবার তাঁকে চুঁচুড়া আদালতে পেশ করা হয়। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত উত্তমের জামিন মঞ্জুর করে। আর তার পরেই প্রশ্ন আরও জোরালো—রাতে গ্রেফতারি, দিনে জামিন! হচ্ছেটা কী?
গ্রেফতারের পর উত্তমের দাবি, ‘‘তৃণমূল করার জন্যই আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।’’ তাঁর আরও বক্তব্য, তিনি কোথাও পালিয়ে যাননি। কলকাতায় নিজের বাড়িতেই ছিলেন। ফলে পুলিশের দাবি, তাঁকে খোঁজা হচ্ছিল—তার সঙ্গে উত্তমের ‘বাড়িতেই থাকার’ দাবির ফারাক নিয়েও রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে চাপানউতোর।
মামলার অভিযোগকারী কলকাতার ব্যবসায়ী রাজেশ আগরওয়াল। তাঁর অভিযোগ, তারকেশ্বরের একটি আবাসন প্রকল্পে আর্থিক লেনদেন, জমি এবং নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাটকে কেন্দ্র করে তাঁর সঙ্গে প্রতারণা ও ভয় দেখানোর ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের সূত্রের দাবি, মামলায় ৪০ লক্ষ টাকা তোলাবাজি, নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাট জবরদখল এবং বেআইনি জমি দখলের মতো অভিযোগ রয়েছে।
এই মামলার সূত্র ধরেই ফের সামনে এসেছে তারকেশ্বরের বহুচর্চিত আবাসন প্রকল্পের পুরনো বিতর্ক। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ৭২টি ফ্ল্যাটের প্রকল্পে পুরসভার প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার পরেও ব্যবসায়ীর প্রাপ্য সম্পত্তি ও অর্থ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। উত্তম কুণ্ডু ও তাঁর স্ত্রী কুহেলি কুণ্ডুর বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়েও। অভিযোগ যদি এতটাই গুরুতর হয়ে থাকে, তা হলে গ্রেফতারের পর পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করা হল না কেন? তদন্তের স্বার্থে রিমান্ডের প্রয়োজন মনে করা হয়নি কেন? নাকি তদন্তকারী সংস্থার কাছে সেই মুহূর্তে তার প্রয়োজন ছিল না?
অবশ্য পুলিশি রিমান্ড চাওয়া হবে কি না, তা তদন্তকারী সংস্থার সিদ্ধান্তের বিষয়। মামলার তথ্যপ্রমাণ, অভিযোগের প্রকৃতি এবং তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতেই সাধারণত সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাই শুধু রিমান্ড না চাওয়াকে কেন্দ্র করে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। তবে এই ঘটনাকে ঘিরে প্রশ্ন ওঠা থামছে না।
রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে চাপানউতোর। বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্ব ও সমর্থকদের একাংশের কটাক্ষ, ‘‘তারকেশ্বরবাসী কয়েক ঘণ্টার একটি সিনেমা দেখল রঙিন পর্দায়! তারকেশ্বরের মানুষ অনেক দিন ভাল সিনেমা দেখেনি। উষা আর রবীন্দ্র সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবে এই কমেডি সিনেমাটি খুব সুন্দর সাফল্য অর্জন করেছে।’’
নাম না করে তাঁদের আরও দাবি, ‘‘এই সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রী, প্রযোজক এবং পরিচালকেরাও অনেক মুনাফা অর্জন করেছেন। তবে আমরা হাল ছাড়ছি না। এই সিনেমায় কারা কারা ইনভেস্ট করেছে, তা খুঁজে বার করা হবে।’’
এমনকি উত্তম কুণ্ডুর পাশে যাঁরা দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের নিয়েও তথ্য সংগ্রহের দাবি করেছেন ওই বিজেপি নেতৃত্ব। তাঁদের বক্তব্য, ‘‘যাঁদের চোখের জল উত্তম কুণ্ডুর জন্য বেরিয়েছে, সেই সমস্ত তথ্য নিয়ে আবার উত্তমবাবুর বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হব।’’
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও তাঁদের অভিযোগ, ‘‘প্রশাসন ভরসাযোগ্য কাজ করেনি।’’
অন্যদিকে, উত্তমের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক কারণেই তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। আদালত তাঁকে জামিনও দিয়েছে। ফলে আইনি বিচারে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনও প্রমাণিত নয়।
তাই প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে—অভিযোগগুলি যদি গুরুতর হয়, তবে তদন্তের ক্ষেত্রে সেই গুরুত্ব কতটা প্রতিফলিত হল? আর অভিযোগের ভিত্তি যদি দুর্বল হয়, তা হলে গ্রেফতারির প্রয়োজনই বা কেন হল?
রাতে কলকাতা থেকে গ্রেফতারি, পর দিন আদালতে পেশ, জামিন, পুলিশের দাবি বনাম অভিযুক্তের বক্তব্য এবং তার সঙ্গে রাজনৈতিক তরজা—সব মিলিয়ে উত্তম কুণ্ডু-কাণ্ডে আপাতত রহস্যের জট কাটার বদলে আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এখন নজর তদন্তের দিকে। অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ সামনে আসে, তদন্ত কোন পথে এগোয় এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর মেলে কি না—সেটাই দেখার।

8697937345









