নামী বহুজাতিক সংস্থার চাকরি ছেড়ে সাইবার প্রতারণা! চন্দননগর পুলিশের জালে ১২, সামনে আসছে বড় চক্রের হদিশ
নিজের মেধা ও যোগ্যতায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা। তারপর নামী বহুজাতিক আইটি সংস্থায় চাকরি। কিন্তু সেই চাকরি ছেড়ে শেষ পর্যন্ত সাইবার প্রতারণার দুনিয়ায় পা রাখার অভিযোগ! চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের সাইবার গোয়েন্দাদের বড়সড় অভিযানে গ্রেফতার ১২ জন। ধৃতদের বয়স ২২ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। উদ্ধার হয়েছে একাধিক ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, প্যান কার্ড, চেকবই, ব্যাঙ্কের পাশবই, মোবাইল ফোন এবং সিম কার্ড। গোটা দেশজুড়ে এই চক্রের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক তদন্তে অনুমান পুলিশের।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের মধ্যে উত্তরপাড়ার এক যুবক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে একটি নামী মাল্টিন্যাশনাল আইটি কোম্পানিতে চাকরিও পান। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে ভালো চাকরি থাকা সত্ত্বেও পরবর্তীতে সেই চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। অভিযোগ, এরপরই সাইবার প্রতারণার কারবারে যুক্ত হয়ে পড়েন। কীভাবে তিনি এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হলেন এবং তাঁর ভূমিকা ঠিক কতটা ছিল, তা জানতে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।
তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী। ধৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে একাধিক ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, প্যান কার্ড, চেকবই, ব্যাঙ্কের পাশবই, তিনটি মোবাইল ফোন এবং সাতটি মোবাইল সিম কার্ড। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীগুলির মাধ্যমে অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, অভিযুক্তরা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষকে টার্গেট করত না। দেশের বিভিন্ন রাজ্যের বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাইবার প্রতারণা চালানো হত। কখনও হোয়াটসঅ্যাপ বা মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে বিভিন্ন লিঙ্ক পাঠানো হত। আবার কখনও সাহায্য করার অছিলায় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেই তথ্য ব্যবহার করেই পরবর্তী পর্যায়ে প্রতারণা করা হত বলে তদন্তকারীদের অনুমান।
এই ধরনের প্রতারণার অভিযোগ সামনে আসার পরই তদন্তে নামে চন্দননগর পুলিশের সাইবার থানা। প্রযুক্তিগত তথ্য এবং বিভিন্ন সূত্রের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত তদন্তকারীদের হাতে আসে একাধিক অভিযুক্তের সন্ধান। এরপর অভিযান চালিয়ে ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
চন্দননগর পুলিশের ডিসি ডিডি রূপান্তর সেনগুপ্ত জানান, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বাড়ি বিভিন্ন এলাকায়। তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে তাঁদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। ধৃতদের মধ্যে কয়েকজনের নিজেদের মধ্যে পরিচয় ও যোগাযোগ ছিল। আবার কয়েকজনের ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় ছিল না। তবে তাঁদের অপরাধের কৌশলের মধ্যে যথেষ্ট মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তদন্তকারীদের মতে, সাইবার প্রতারণার এই চক্রটি অনেকটা জামতাড়া গ্যাংয়ের ধাঁচে কাজ করে থাকতে পারে। অর্থাৎ, বিভিন্ন কৌশলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করা এবং তারপর প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতারণার জাল বিস্তার করা হত বলে সন্দেহ। তবে এই চক্রের সঙ্গে জামতাড়ার কোনও সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই চক্রের নেটওয়ার্ক কতটা বড়, সেটিই এখন পুলিশের কাছে বড় প্রশ্ন। পুলিশের অনুমান, ধৃত ১২ জনই হয়তো এই চক্রের শেষ কথা নয়। তাঁদের সঙ্গে আরও বহু মানুষ যুক্ত থাকতে পারেন। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে থাকার কারণে প্রত্যেক সদস্যের কাছে পৌঁছতে সময় লাগতে পারে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সেই নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, এই চক্রের মাধ্যমে ঠিক কতজন মানুষ প্রতারিত হয়েছেন এবং মোট কত টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, সেই হিসাব এখনও পুলিশের হাতে স্পষ্ট নয়। আরও অভিযোগ সামনে আসতে পারে বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা। উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন, সিম কার্ড, ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য সামগ্রী পরীক্ষা করে প্রতারণার পরিমাণ ও পদ্ধতি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
সাইবার প্রতারণার ঘটনা ক্রমশ বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষকে ফের সতর্ক করেছে পুলিশ। অপরিচিত ব্যক্তির পাঠানো কোনও লিঙ্কে ক্লিক না করা, অচেনা নম্বর থেকে আসা ফোনে ব্যাঙ্কের তথ্য না দেওয়া এবং কোনও পরিস্থিতিতেই ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে শেয়ার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের বার্তা, সামান্য অসতর্কতাই বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই হোয়াটসঅ্যাপ, এসএমএস কিংবা ফোনে কেউ কোনও লিঙ্ক পাঠালে বা কোনও সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে ব্যক্তিগত তথ্য চাইলে সতর্ক হতে হবে।
চন্দননগর পুলিশের এই অভিযানে আপাতত ১২ জন গ্রেফতার হলেও তদন্ত এখানেই শেষ নয়। বরং তদন্ত যত এগোবে, সাইবার প্রতারণার এই নেটওয়ার্কের আরও কতজনের নাম সামনে আসে এবং গোটা দেশের কোথায় কোথায় এর শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে, এখন সেটাই দেখার।

8697937345









