হিন্দমোটরে বহুতলের ছাদ থেকে পড়ে যুবকের মৃত্যু, তদন্তে উত্তরপাড়া থানার পুলিশ
উত্তরপাড়া: উত্তরপাড়ার হিন্দমোটর এলাকায় বহুতলের ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু হল আনুমানিক ৩০ বছর বয়সি এক যুবকের। মৃতের নাম স্বরূপ নন্দ সাহু। তিনি র্যাপিডো বাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন বলে পরিবার ও প্রতিবেশীদের সূত্রে জানা গিয়েছে। রাতের অন্ধকারে পাঁচতলার ছাদ থেকে কীভাবে তিনি নিচে পড়ে গেলেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য। ঘটনায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে উত্তরপাড়া থানার পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, হিন্দমোটর এলাকার একটি আবাসনে স্ত্রী কিরণবালা সাহু এবং মায়ের সঙ্গে থাকতেন স্বরূপ। ঘটনার আগের রাতে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে আবাসনের পাঁচতলার ছাদে ঘুমিয়েছিলেন বলে জানা যায়। রাত আনুমানিক ১টা নাগাদ আচমকাই ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান স্বরূপ। এরপর আবাসনের নিচে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আবাসনের বাসিন্দা এবং স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে জড়ো হন। তড়িঘড়ি তাঁকে উদ্ধার করে উত্তরপাড়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা স্বরূপকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় উত্তরপাড়া থানার পুলিশ। আবাসনের নিচে যে জায়গায় স্বরূপ পড়েছিলেন, সেই এলাকা ঘিরে ফেলে তদন্ত শুরু করেন তদন্তকারীরা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনাটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার আগে ও পরে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, ছাদে ঠিক কী ঘটেছিল এবং কীভাবে স্বরূপ নিচে পড়লেন—এসব বিষয়ই তদন্তের আওতায় রয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুন কিরণবালা সাহুর সঙ্গে স্বরূপের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় তিনি ঋণ করেছিলেন এবং বিয়ের জন্য বেশ কিছু টাকা খরচ হয়েছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীতে র্যাপিডো বাইক চালিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। তাঁর মা ও স্ত্রী একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। স্বরূপের বাবা বাইরে থাকেন বলে প্রতিবেশীদের সূত্রে জানা গিয়েছে।
ঘটনার পর পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়েও নানা দাবি সামনে এসেছে। স্থানীয় প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর তাপস মুখোপাধ্যায় বলেন, পরিবারটি আর্থিক সমস্যার মধ্যে ছিল বলে তিনি শুনেছেন। কয়েকদিন আগে তাঁদের ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
তাপস মুখোপাধ্যায়ের দাবি, আর্থিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়েছিল এবং তার জেরে স্বরূপ মানসিক অবসাদে ছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গিয়েছিল। তবে এই দাবি পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। স্বরূপের মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনও কারণে হয়েছে, তা পুলিশের তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী অসীম বারিক জানান, স্বরূপ তাঁদের পরিচিত ছিলেন। তিনি র্যাপিডো বাইক চালাতেন। কীভাবে তিনি ছাদ থেকে পড়ে গেলেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তাঁর কথায়, ওই ফ্ল্যাটে স্বরূপ, তাঁর স্ত্রী এবং মা থাকতেন। স্বরূপের বাবা বাইরে থাকেন। ঘটনার প্রকৃত কারণ পুলিশি তদন্তেই সামনে আসবে বলে জানান তিনি।
ঘটনার তদন্তে পুলিশ পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। বিশেষ করে মৃতের মা ও স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা। আবাসনের ছাদ, সিঁড়ি, নিচে পড়ার জায়গা এবং আশপাশের পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শ্রীরামপুর ওয়ালশ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। স্বরূপের শরীরে আঘাতের ধরন এবং অন্যান্য শারীরিক তথ্যও তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় থানায় কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি বলে জানা গিয়েছে। তবে পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। ফলে এই মুহূর্তে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনা হিসেবে নিশ্চিত করে দেখছে না পুলিশ।
প্রশ্ন উঠছে, রাতে স্ত্রীকে নিয়ে ছাদে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় ঠিক কী ঘটেছিল? কীভাবে পাঁচতলা থেকে নিচে পড়লেন স্বরূপ? তাঁর পড়ে যাওয়ার আগে কোনও ঘটনা ঘটেছিল কি না, কিংবা আর্থিক সমস্যার কারণে তিনি মানসিক চাপে ছিলেন কি না—সমস্ত বিষয়ই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং তদন্তে উঠে আসা অন্যান্য তথ্যের উপর নির্ভর করছে ঘটনার পরবর্তী দিক। আপাতত স্বরূপ নন্দ সাহুর আকস্মিক মৃত্যুতে হিন্দমোটর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একইসঙ্গে রহস্যজনক এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশের তদন্তের দিকেই তাকিয়ে পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

8697937345















