আরামবাগে জনকল্যাণ শিবিরে উপচে পড়া ভিড়, বিভ্রান্তি ঘিরে ক্ষোভ — ক্ষমা চাইলেন বিধায়ক হেমন্ত বাঘ
আরামবাগ, হুগলি, ১৫ জুন ২০২৬ : সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ফর্ম ফিলাপকে কেন্দ্র করে আরামবাগ ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিস (বিডিও অফিস) চত্বরে সোমবার সকাল থেকেই দেখা গেল নজিরবিহীন ভিড়। ভোর থেকেই বিভিন্ন পঞ্চায়েত এলাকা থেকে শত শত মানুষ লাইনে দাঁড়ান, কিন্তু একাধিক প্রকল্পের ফর্ম না পাওয়ায় চরম ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
বিশেষ করে বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং যুবশক্তি প্রকল্পের ফর্ম না মেলায় বহু মানুষকে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়। অভিযোগ ওঠে, আগে থেকে সঠিক তথ্য না দেওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা বয়স্ক মানুষদের অযথা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান আরামবাগের বিধায়ক হেমন্ত বাঘ। তিনি স্বীকার করেন যে তথ্য প্রচারে ‘মিস কমিউনিকেশন’ হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান।
বিধায়ক বলেন, “তিরোল অঞ্চল থেকে মাইকিং করে জানানো হয়েছিল যে বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা সহ একাধিক প্রকল্পের ফর্ম ফিলাপ হবে। কিন্তু বাস্তবে এই চারটি পোর্টাল এখনও চালু হয়নি। এর জন্য আমি দুঃখিত এবং সকলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। পোর্টাল চালু হলে আবার পঞ্চায়েতের মাধ্যমে জানানো হবে।”
তিনি আরও জানান, বর্তমানে প্রায় ১৫১টি সরকারি দপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য রেজিস্ট্রেশন এবং আবেদন প্রক্রিয়া চলছে। অনলাইনে মেমো নম্বর জেনারেট করে আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়ে চূড়ান্ত আবেদন করতে হবে।
জানা গেছে, ১৫, ১৬ এবং ১৭ জুন — এই তিনদিন ধরে আরামবাগ ব্লকের একাধিক জায়গায় জনকল্যাণ শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। পৌর এলাকায় রবীন্দ্রভবন ও পৌরসভা অফিসে এবং গ্রামীণ এলাকায় তিরোল, বাতানল, মলাপুর, সালেপুর, গৌরহাটি সহ একাধিক অঞ্চলে ক্যাম্প চলছে।
তবে বাস্তবে ক্যাম্পে এসে চরম সমস্যার মুখে পড়েন সাধারণ মানুষ। তিরোল থেকে আসা ভগবতী হাঁটি জানান, “মাইকিং শুনে শাশুড়িকে নিয়ে সকাল ১০টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছি। পরে এসে জানানো হচ্ছে ফর্ম নেই। আবার পরে আসতে বলা হচ্ছে।”
একই সুর শোনা যায় বাতানল এলাকার বাসিন্দা অসীমান শেখের গলায়। তিনি বলেন, “আমি স্ট্রোকের রোগী, তবু এই গরমে এসেছি। এসে শুনছি ৭০ বছর না হলে আয়ুষ্মান ভারত হবে না। এইভাবে মানুষকে হয়রানি করা ঠিক নয়।”
অন্যদিকে, আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। প্রথমে বলা হয় ৭০ বছরের বেশি বয়স হলেই ফর্ম পাওয়া যাবে, পরে আবার জানানো হয় যে কম বয়সীদের ক্ষেত্রে আগে পোর্টালে যাচাই করতে হবে। ফলে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বহু মানুষ বুঝতে পারছিলেন না তারা আদৌ ফর্ম পাবেন কি না।
জব কার্ডের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বহু আবেদনকারী জানান, দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেও জব কার্ড পাননি। তাই নতুন করে আবেদন করতে এসেছেন।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসে। অনেকেই অভিযোগ করেন, সোশ্যাল মিডিয়া ও মাইকিং-এর মাধ্যমে ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছে। ফলে বহু মানুষ কাজ ফেলে, টাকা খরচ করে এখানে এসে হতাশ হয়ে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মানিক বটব্যাল বলেন, “সরকারের সিদ্ধান্ত যদি পরিষ্কার না হয়, তাহলে এই ধরনের শিবির মানুষের জন্য উপকারের বদলে হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব প্রকল্পের ফর্ম এখনও চালু হয়নি, সেগুলি খুব শীঘ্রই চালু করা হবে এবং পুনরায় মাইকিং করে মানুষকে জানানো হবে।
সব মিলিয়ে, আরামবাগের এই জনকল্যাণ শিবিরে একদিকে যেমন মানুষের আগ্রহের ছবি ধরা পড়েছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক বিভ্রান্তির কারণে চরম ভোগান্তিরও চিত্র সামনে এসেছে। আগামী দিনে এই সমস্যার সমাধান কত দ্রুত হয়, সেটাই এখন দেখার।



