বাজেটের দিনেই ভদ্রেশ্বরে বিজেপির নতুন কার্যালয়: ডিএ, শিল্প ও ‘পরিবর্তন’ বার্তায় রাজনৈতিক তাপমাত্রা চড়ল
হুগলি, নিজস্ব সংবাদদাতা: রাজ্যের বাজেট পেশের দিনকে কেন্দ্র করে হুগলির ভদ্রেশ্বরে রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নতুন করে সংগঠন মজবুত করার বার্তা দিল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ভদ্রেশ্বরের সত্যজিৎ রায় সরণিতে অবস্থিত বিষ্ণু মন্দির প্রাঙ্গণে দলের নতুন পার্টি অফিসের উদ্বোধনকে ঘিরে এদিন কার্যত মেলা বসে যায় এলাকায়। সকাল থেকেই দলীয় কর্মী-সমর্থকদের ভিড়, পতাকা, ব্যানার এবং স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।
রাজ্যের বাজেট ঘোষণার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। একদিকে সংগঠন বিস্তার, অন্যদিকে সরকারি নীতির প্রশংসা এবং বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা—সব মিলিয়ে একাধিক বার্তা ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে এই মঞ্চ থেকে।
দলীয় নেতৃত্বের দাবি, পুরনো কার্যালয়ে জায়গার অভাব এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তার কারণেই নতুন এই জায়গা বেছে নেওয়া হয়েছে। বিষ্ণু মন্দির সংলগ্ন এলাকা হওয়ায় সাধারণ মানুষের যাতায়াতও বেশি—ফলে দ্রুত পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন নেতৃত্ব।
শক্তি কেন্দ্রের প্রমুখ জিতেন্দ্র সাউ বলেন, “আজকের দিনটা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শুভ। আমরা যে প্রত্যাশা করেছিলাম, তার থেকেও বেশি মানুষের উপস্থিতি হয়েছে। আগের কার্যালয়ে অনেক সময় জায়গার অভাবে অসুবিধা হচ্ছিল। তাই মানুষের সুবিধার কথা মাথায় রেখেই এই নতুন কার্যালয় উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, এই কার্যালয় শুধুমাত্র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নয়, এলাকার সাধারণ মানুষের সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করবে। “আমরা চাই, মানুষ যেকোনো সমস্যায় সরাসরি এখানে এসে যোগাযোগ করতে পারেন। দলীয় কর্মীরা নিয়মিত উপস্থিত থাকবেন,” বলেন তিনি।
অন্যদিকে, এই মঞ্চ থেকেই রাজ্যের বাজেট নিয়ে সরব হন বিজেপি নেত্রী এবং উত্তরপাড়া কনভেনার দুর্গা বর্মা। তিনি বলেন, “আজকের দিনটা সত্যিই মানুষের আনন্দের দিন। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ডিএ বৃদ্ধির ঘোষণা অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক।”
ডিএ (মহার্ঘ ভাতা) নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা অসন্তোষের প্রসঙ্গ তুলে তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকারগুলি এই বিষয়ে উদাসীন ছিল। “সিপিএম এবং তৃণমূল—দুই আমলেই কর্মচারীদের দাবি পূরণ হয়নি। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই ডিএ বৃদ্ধি করেছে,” দাবি করেন তিনি।
রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কড়া ভাষায় আক্রমণ শানান দুর্গা বর্মা। তাঁর অভিযোগ, “গত ১৫ বছরে রাজ্যে ভয় এবং অত্যাচারের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষ সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এখন তারা নতুন সরকারের উপর আস্থা রাখছেন।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘সবকা সাথ, সবকা বিশ্বাস’ নীতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই নীতিকে সামনে রেখেই উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাঁর কথায়, “এই সরকার সবার জন্য কাজ করতে চায়। ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়—মানুষই এখানে মুখ্য। সেই লক্ষ্য নিয়েই উন্নয়ন হচ্ছে এবং আগামী দিনে রাজ্যে শিল্পোন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলবে।”
তবে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। স্থানীয় শিল্পের দুরবস্থার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। চাপদানির নববুক মিল এবং জেএসআই কটন মিলের দীর্ঘদিনের বন্ধ অবস্থার কারণে শ্রমিকদের দুর্দশার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই মিলগুলির সঙ্গে বহু পরিবারের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা চরম সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। দ্রুত এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”
মন্দির প্রাঙ্গণে দলীয় কার্যালয় স্থাপন নিয়ে উঠা বিতর্কেরও জবাব দেন দুর্গা বর্মা। তিনি বলেন, “এখানে শুধু মন্দিরই নেই, আশেপাশে প্রচুর মানুষের বসবাস। আমরা এমন জায়গা চেয়েছিলাম যেখানে মানুষ সহজে পৌঁছতে পারেন। মানুষ যেমন বিশ্বাস নিয়ে মন্দিরে আসেন, তেমনই এই কার্যালয় থেকেও তারা সাহায্য পাবেন—এই বার্তাই আমরা দিতে চাই।”
এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জিতেন্দ্র সাউ (শক্তি কেন্দ্রের প্রমুখ), দুর্গা বর্মা (উত্তরপাড়া কনভেনার), আক্তার আলি (সংখ্যালঘু সম্পাদক), রানু মণ্ডল (চাপদানী মণ্ডল ১-এর প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট), অশোক সিং (জেলা নেতা), সূরজ শর্মা (কর্মী) এবং দীননাথ প্রসাদ (শক্তি কেন্দ্রের প্রমুখ) সহ একাধিক নেতৃত্ব ও কর্মী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট ঘোষণার দিনকে কেন্দ্র করে এই ধরনের সংগঠনমূলক কর্মসূচি নিছক কাকতালীয় নয়। বরং এর মাধ্যমে একদিকে সরকারকে সমর্থন জানানো, অন্যদিকে সংগঠনের ভিত্তি আরও মজবুত করা—এই দুই লক্ষ্যই স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ইস্যু যেমন শিল্পসংকট, কর্মসংস্থান, এবং জনসংযোগ—এসব বিষয়কেও সামনে আনা হয়েছে কৌশলগতভাবে।
সব মিলিয়ে, ভদ্রেশ্বরের এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুধু একটি নতুন পার্টি অফিস চালুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বার্তা বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ, যেখানে বাজেট, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং পরিবর্তনের রাজনীতি—সবকিছুরই প্রতিফলন দেখা গেছে।
আগামী দিনে এই কার্যালয়কে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক সক্রিয়তা আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলিও এই পদক্ষেপকে কীভাবে মোকাবিলা করে, সেদিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।





