তারকেশ্বরে শ্রাবণী মেলা ঘিরে উত্তেজনা: দোকান বন্ধে বিপাকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা

Published on: July 23, 2026
---Advertisement---

শ্রাবণী মেলায় তারকেশ্বরে উত্তেজনা: ভক্তদের স্বাচ্ছন্দ বনাম স্থানীয়দের রুজিরুটি, জটিল পরিস্থিতিতে প্রশাসন

অস্থায়ী দোকান বন্ধের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ, রাস্তায় নামলেন ব্যবসায়ীরা—সমাধান খুঁজছে প্রশাসন

সিঙ্গুর টিভি নিউজ ওয়েবডেস্ক : শ্রাবণী মেলাকে কেন্দ্র করে হুগলির তারকেশ্বর মেলা প্রাঙ্গণ ও সংলগ্ন এলাকায় তৈরি হয়েছে এক জটিল ও সংবেদনশীল পরিস্থিতি। প্রতিবছরের মতো এবারও শ্রাবণ মাসে তারকেশ্বর ধাম ভরে উঠেছে লাখ লাখ পূণ্যার্থী ও জলযাত্রীর ভিড়ে। বিশেষ করে বৈদ্যবাটি রোড ধরে আগত ভক্তদের স্রোত সামলাতে প্রশাসন ও মন্দির কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে একাধিক ব্যবস্থা।

এরই মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—রাস্তার ধারে অস্থায়ী দোকান বসাতে না দেওয়া। মন্দির বোর্ডের দাবি, ভক্তদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত, নিরাপত্তা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছরই অতিরিক্ত ভিড়, যানজট এবং পদপিষ্ট হওয়ার মতো দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। তাই এবারের মেলায় কিছুটা কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন।

কিন্তু এই সিদ্ধান্তে চরম বিপাকে পড়েছেন এলাকার বহু স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। জানা যাচ্ছে, গত ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে বহু পরিবার শ্রাবণী মেলার সময় রাস্তার ধারে চা, টিফিন, ঠান্ডা জল, ফুল-বেলপাতা ও বিভিন্ন পূজার সামগ্রীর অস্থায়ী দোকান বসিয়ে সংসার চালিয়ে আসছেন। এই কয়েক সপ্তাহের আয়ের উপরই নির্ভর করে তাদের সারা বছরের জীবনযাত্রা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ করে দোকান বসাতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ফলে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা। একদিকে সন্তানের পড়াশোনা, অন্যদিকে বাড়ির চিকিৎসা খরচ—সব মিলিয়ে কীভাবে সংসার চলবে, সেই চিন্তায় দিশেহারা বহু পরিবার।

এক স্থানীয় ব্যবসায়ীর কথায়, “আমরা সারা বছর অপেক্ষা করি এই মেলার জন্য। এই সময়ে যা রোজগার করি, সেটাই দিয়ে বছরের খরচ চালাই। এখন যদি দোকান বসাতে না দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের বাঁচার উপায় কী?”

আরেকজনের দাবি, “মন্দিরই আমাদের বড় কারখানা। এখানে কোনো শিল্প নেই। আমরা মেলার ওপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকি।”

এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখান তারা। অভিযোগ ওঠে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা বা পুনর্বাসনের পরিকল্পনা ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।

ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে চাপানউতোর। আরামবাগ সাংগঠনিক জেলার সহসভাপতি গণেশ চক্রবর্তী বিষয়টি নিয়ে বলেন, “পূর্ণার্থীদের সুবিধা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই এই এলাকার মানুষদের জীবিকার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের উচিত দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করা।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান ব্যবস্থাপনায় ‘লকগেট’ পদ্ধতির কারণে কৃত্রিমভাবে ভিড় তৈরি হচ্ছে। হঠাৎ করে গেট বন্ধ ও খোলার ফলে মানুষের মধ্যে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও বাড়ছে। তার দাবি, ভিড় নিয়ন্ত্রণে আরও বৈজ্ঞানিক ও মানবিক পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত।

অন্যদিকে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে সাম্প্রতিক কিছু দুর্ঘটনার পর তারা কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। তাই রাস্তার ধারে দোকান বসানো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে প্রশাসন ও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। ইতিমধ্যেই থানায় গণডেপুটেশন জমা পড়েছে এবং প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের দাবিও জানানো হয়েছে।

স্থানীয়দের একাংশ জানিয়েছেন, যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে তারা আগামী দিনে আরও বড় আন্দোলনে নামবেন। এমনকি অনশন কর্মসূচির কথাও ভাবা হচ্ছে। এক প্রতিবাদীর কথায়, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছি। কিন্তু আমাদের পেটে লাথি মারা হলে আমরা চুপ করে থাকব না।”

সব মিলিয়ে, একদিকে লক্ষ লক্ষ পূণ্যার্থীর নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ, অন্যদিকে বহু বছরের ঐতিহ্যবাহী জীবিকার সংকট—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বর্তমানে তারকেশ্বরের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

এখন দেখার, প্রশাসন, মন্দির কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমন্বয়মূলক সমাধান বেরিয়ে আসে কিনা। কারণ এই সমস্যার সমাধান শুধু একটি সিদ্ধান্তে নয়, বরং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনাতেই সম্ভব।

ভ্রমণ দিশারী ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস্

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now